ঢাকা [english_date] | [bangla_date]
প্রকাশিত: 7:32 PM, February 17, 2026
+
বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি। তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক দল বিএনপি। সেই দলের হয়ে মা খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এখন তাদের সন্তান তারেক রহমান ১৭ বছরের নির্বাসন থেকে ফিরে দুই মাসের মাথায় নির্বাচনে বিপুল জয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিচ্ছেন।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে যেতে হয়েছিল তারেক রহমানকে। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য তিনি দেশ ছাড়েন। ওই বছর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে হেরে যায় বিএনপি। এর পরের ১৭ বছর ছিল বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়। নেতাকর্মীরা মার খেয়েছে, ‘গুম’ হয়েছে; খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়েছে। লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে থেকে সেসব মোকাবিলা করতে হয়েছে তারেক রহমানকে। তবে প্রবাসে থেকেও দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বে দেন তিনি।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ তিনি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের নেতা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনে বিএনপির অভাবনীয় সাফল্যের পর দেশের ১৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ মঙ্গলবার বিকেলে শপথ নেবেন বিএনপিপ্রধান। নির্বাচনে তাঁর দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিশ্চিত করেছে। ফলে তিনিই হবেন দেশের দ্বিতীয় পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির এই বিপুল বিজয়কে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত বছর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে লাখো জনতার সংবর্ধনা সমাবেশে তারেক রহমান তাঁর একটি পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছিলেন। মার্কিন অধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক উক্তির অনুকরণে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ নির্বাচনী প্রচারের সময় সারাদেশে তিনি সেই পরিকল্পনার কথাই বলে বেড়িয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে জনমত গঠন করেছেন, পাশাপাশি দলের তৃণমূলকেও সংগঠিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এই উত্থান গত তিন দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে চলে আসা দ্বিমেরূকরণের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ নির্বাসনে থাকা ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ১৭ বছরের বেশি সময় পর দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মধ্যে তাঁর মা খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর ১০ দিন পর দলের হাল ধরেন তারেক। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি দলকে সুসংগঠিত করতে বিরামহীন কাজ করেন। দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন এবং নির্বাচনী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চষে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা। লাখো নেতাকর্মী আর সমর্থক তাঁর প্রচারণায় অংশ নেন।
তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে তারেক যখন কিশোর, তখন এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন জিয়াউর রহমান। এর পর থেকে খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সরকার গঠন করেন।
তারেক রহমান ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এর আগে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের একজন সাক্ষী ও অংশগ্রহণকারী। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, যখন তাঁর পিতা জিয়াউর রহমান বীরউত্তম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ শুরু করেন, তখন তাঁকে, তাঁর মা ও ভাইকে অন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। তবে ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ায় সেই লেখাপড়া আর শেষ করতে পারেননি তিনি।
শৈশব ও কৈশোর ঢাকায় কাটানো তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে ২২ বছর বয়সে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হন। তবে দলীয় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের পাতানো নির্বাচনের প্রাক্কালে স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে তাঁর মায়ের সঙ্গে গৃহবন্দি করে একাধিকবার। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের জুনে তাঁকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। ২০০৫ সালে তিনি দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এই সম্মেলনের সময় তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা, স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করা এবং সমর্থকদের চিন্তাধারা শোনেন এবং জনগণের কাছে বিএনপির কর্মসূচি প্রচার করেন। তিনি কৃষকদের জন্য সরকারি ভর্তুকি, বয়স্কদের জন্য ভাতা, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্লাস্টিক ব্যাগবিরোধী আন্দোলন এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি বিতরণ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন, যা স্কুলে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমিয়ে ভারসাম্য আনতে সহায়ক হয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্মেলনে নিবন্ধনকারীদের অন্তত ১৮ হাজার চিঠির উত্তর দেন।
২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। অভিযোগ রয়েছে, ১৮ মাস কারাগারে থাকাকালে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। ওই সময়ের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আদালতে হাজির করার সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট চিকিৎসার জন্য তিনি জামিন এবং ৩ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর এক সপ্তাহ পর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তিনি। সে সময় দেশে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছিল। প্রবাসে থাকাকালেই তিনি দলের নীতি-কৌশল ঠিক করতেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এর মাঝে ২০১৫ সালে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে ব্যক্তিগত শোক সইতে হয় তাঁকে।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন তারেক রহমানকে রাজনীতিতে আরও সহনশীল ও ধীর-স্থির করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা ও দণ্ড বাতিল হলে দেশে ফেরার আইনি বাধা কাটে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরলে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সে সময় বিশাল জনসমাবেশে তিনি বলেছিলেন– ‘উই হ্যাভ এ প্লান’।
১৯৯৪ সালে তারেক রহমান প্রাক্তন নৌবাহিনী প্রধান এবং পরবর্তী সরকারের দুইবারের মন্ত্রী প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা জোবাইদা রহমানকে বিয়ে করেন। জোবাইদা রহমান একজন কার্ডিওলজিস্ট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন। ব্যারিস্টার জাইমা জারনাজ রহমান তাদের একমাত্র মেয়ে।
প্রধান সম্পাদক: নুরুল ইসলাম শেফুল অ্যাডভোকেট
সম্পাদক: মোঃ মতিন বকস
নির্বাহী সম্পাদক: শরীফ আহমেদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আফরোজ রায়হান
বার্তা সম্পাদক: পায়েল আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
মল্লিক কমপ্লেক্স পুরানা পল্টন ঢাকা-১০০০
ই-মেইল:nisheful@gmail.com
মোবাইল:+880 1778887058.01711224307.
01706760730,01711653241
Design by Raytahost