ভ্যাটের চাপে গ্রাহক হারাচ্ছে সুপারশপ

প্রকাশিত: 7:01 PM, June 1, 2021

ভ্যাটের চাপে গ্রাহক হারাচ্ছে সুপারশপ

একই কোম্পানির পণ্য। একই এলাকায় বেচা-বিক্রি হচ্ছে। গায়ের দামও এক। কিন্তু পণ্যটি কিনতে গিয়ে একেক জায়গায় একেক দাম দিতে হচ্ছে ক্রেতাকে। সচেতন ভোক্তাদের এই বৈষম্যের পথে ঠেলে দিয়েছে বাড়তি ভ্যাট ওরফে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন কর। এই বাড়তি ভ্যাট দিয়ে সারা দেশের ভোক্তাদের সুপারশপ বিমুখ করা হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে আধুনিক, উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পণ্য বেচাকেনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ভেস্তে যেতে বসেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মহল্লার দোকান কিংবা জেনারেল স্টোর থেকে পণ্য কিনলে ক্রেতাকে বাড়তি কোনও ভ্যাট দিতে হচ্ছে না। অথচ পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেচা-বিক্রি করা সুপারশপ থেকে কিছু কিনতে গেলেই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ ভ্যাট। এভাবেই বছরের পর বছর পরোক্ষ করের মাধ্যমে সুপারশপের ক্রেতাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে।

আইন অনুযায়ী বড়, মাঝারি ও ছোট সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই ইসিআর মেশিন থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইলেকট্রনিক ফিসকেল ডিভাইস (ইএফডি) বা ইসিআর মেশিনের বালাই নেই অধিকাংশ জেনারেল স্টোরগুলোতে। গুরুত্বপূর্ণ এই মেশিন না থাকার কারণে জানা যাচ্ছে না দোকানগুলোতে প্রতিদিন কতো টাকার লেনদেন হচ্ছে। আর তাই সরকার ওসব দোকান থেকে কোনও রাজস্বও পাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ভ্যাটের মাধ্যমে পক্ষান্তরে সুপারশপগুলোকেই চেপে ধরা হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। এই পলিসি বদলানো উচিত।’

তিনি বলেন, সুপারশপের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ ভ্যাট স্থগিত করা উচিত। আর যদি সেটা করা সম্ভব না হয়, তবে সব জেনারেল স্টোর বা ছোটবড় সব দোকান ইএফডি মেশিনের আওতায় অথবা অনলাইনের আওতায় এনে সবার কাছ থেকে ১ বা ২ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থা করা উচিত। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে মীনা বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহীন খান বলেন, যে পণ্য জেনারেল স্টোর থেকে ক্রেতা ৬৫০ টাকায় কিনতে পারছেন, সেই একই পণ্য সুপারশপ থেকে কিনলে তাকে আরও ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে। এতে সুপারশপ থেকে সরকার রাজস্ব পেলেও ক্রেতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু শহরে যত জেনারেল স্টোর আছে, সেগুলোর হিসাব রাখার জন্য ইসিআর মেশিন নেই। এগুলো থেকে ভ্যাট আদায় হচ্ছে না। এতে সরকার জেনারেল স্টোরগুলো থেকে রাজস্ব পাচ্ছে না, অন্যদিকে সুপার মার্কেটগুলো ক্রেতা হারাচ্ছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ধানমণ্ডিতে ৩৯টি জেনারেল স্টোর আছে। এই ৩৯টি জেনারেল স্টোর এক করলে ৩টি মীনা বাজারের সমান হবে। দেখার বিষয় যে, মীনা বাজার থেকে সরকার ভ্যাট পেলেও এই ৩৯টি জেনারেল স্টোর থেকে এক টাকাও রাজস্ব পাচ্ছে না। দেশের সব জেনারেল স্টোরকে ইএফডি রাখা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ভ্যাট আইন ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষতির কারণ হলেও সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভ্যাট থাকতে হবে। তবে সুপারশপের ক্রেতাদের অতিরিক্ত যে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়, এটা স্থগিত হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আবার একইভাবে সব সুপারশপ ও সব জেনারেল স্টোর বা সব দোকানকে অনলাইন বা ইএফডি মেশিনের আওতায় আনা উচিত। সেটা কিভাবে সম্ভব তা নিয়ে আমরা এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছি।’

বাংলাদেশ সুপারমার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বলেন, একই পণ্য বাইরের চেয়ে সুপারশপ থেকে বেশি দাম দিয়ে কিনতে কে চায়? যদিও কয়েক বছর ধরে সুপারশপের কেনাকাটায় ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট নির্ধারিত আছে। এই ভ্যাটের কারণে সুপারশপের গ্রাহক বাড়ছে না। সুপারশপের সংখ্যাও বাড়ছে না।

অন্যরা ছাড় দেয়, এখানে উল্টোটা

জানা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে সুপারশপের ব্যবসা উৎসাহিত করতে সেসব দেশের সরকার শুল্ক, কর ও ভ্যাটে ছাড় দিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে হচ্ছে তার ঠিক উল্টোটা।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ বলেন, ‘আমেরিকা, কানাডাসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই শুল্ক কর ও ভ্যাটে ছাড়সহ সুপারশপের ব্যবসায় বিভিন্ন সরকারি সুবিধা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে সুপারশপের ক্রেতাদের ওপর ভ্যাট নামক অস্ত্র দিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। শুধু সুপারশপগুলোর ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ না করে জেনারেল স্টোর তথা সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ১ শতাংশ বা ২ শতাংশ হারে ভ্যাটের আওতায় আনলে সরকারের রাজস্ব বাড়তো।’

তার মতে, একটি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে কোনোভাবেই ১৫ শতাংশের বেশি ভ্যাট হওয়া উচিত নয়।

জটিলতা রয়েছে ভ্যাট ব্যবস্থাপনায়

এদিকে ভ্যাট আইন কার্যকরের দুই বছর পরও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা নিয়ে জটিলতা কাটেনি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মূসকের হার নির্ধারণে গলদ রয়েছে, রেয়াত নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা। রিটার্ন দাখিলেও পোহাতে হয় ভোগান্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন না হওয়ায় ভ্যাট ফাঁকি কমছে না।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডির গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ইসিআর বা ইএফডি ব্যবহারে এনবিআরের যে উদ্যোগ থাকার কথা, সেটি নেই। এখন পর্যন্ত ভ্যাট দেবে এমন সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। এটা এনবিআরের দুর্বলতা। তিনি এনবিআরকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

প্রসঙ্গত, স্বর্ণের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ ২৫টি সেবা খাতে ইএফডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিনামূল্যে এনবিআর থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন সরবরাহ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার দুই বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত ১০ হাজার মেশিনও সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে, সারা দেশে ছোট-বড় ২৫ হাজার শপিংমল বা বিপণিবিতান আছে। ছোট-বড় দোকান আছে ২২ লাখ।

চলতি বছরের জুনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজার ইলেকট্রনিক ফিসকেল ডিভাইস (ইএফডি) বসানো হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।

জানা গেছে, গত বছরের ২৫ আগস্ট ইএফডি উদ্বোধনের পর প্রথম পর্যায়ে ১১৭টি, দ্বিতীয় পর্যায় ১০৬১টি, তৃতীয় পর্যায়ে ২৯৩টিসহ এক হাজার ৪৭১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মেশিন বসানো হয়েছে।

এদিকে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন সরবরাহ করা সম্ভব না হলেও প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান আছে। তা না হলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং নির্ধারিত ভ্যাটের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করা হবে।

এনবিআর সূত্র জানায়, কয়েক বছরে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাড়ে সাত লাখ হলেও নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছে ৩৫-৩৬ হাজার প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সারা দেশে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১৬টি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে সবচেয়ে বেশি ৬১ হাজার ৮৮৯টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নিয়েছে।

চলছে অভিযান

ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দিলেও এনবিআর-এ লোকবলের অভাবে এতোদিন তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি ভ্যাট গোয়েন্দারা বিভিন্ন শপিং মলে ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে অভিযানে নেমেছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ