সিলেট অঞ্চলের জারা লেবু সুঘ্রাণে স্বাদেও …

প্রকাশিত: 11:30 PM, June 29, 2021

সিলেট অঞ্চলের  জারা লেবু সুঘ্রাণে  স্বাদেও …

দেখতে কিছুটা বেঢপ আকৃতির। একেকটির ওজন এক থেকে দেড় কেজিও হয়। খুচরা বিক্রি হয় হালি দরে। সুঘ্রাণের জন্য কোয়ার চেয়ে খোসার কদর কম নয়। লেবুর মতো খাওয়া হয় এটি। বর্ষার এই সময়ে সবজির হাটে লেবুর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এই ফল হচ্ছে জারা।

সিলেট অঞ্চলের এই জারা লেবু এবার যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। নতুন একটি জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় জারার চিরচেনা আদল, আকৃতি আর স্বাদেও পরিবর্তন এসেছে। নতুন জাতের জারা লেবুর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বারি-১’।

এ মৌসুমে নতুন জারার পুরোপুরি বাজারজাত হওয়ার খবরটি আনন্দের সঙ্গে জানিয়েছে ‘জৈন্তাপুর সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র’। সিলেটে লেবুজাতীয় ফল নিয়ে গবেষণা করা একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান এটি। সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান নজরুল জানিয়েছেন, জারা লেবুর নানা জাত এতকাল শুধু চাষিদের মুখে মুখে ছিল। প্রায় তিন বছরের চেষ্টায় নতুন জাতের জারা লেবু এখন উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে।

বারি-১ জাতের নতুন জারা লেবুটি দেখলেই চেনা যায়। মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, দেখতে নানা আকৃতির হয় জারা। আকার দেখে নামকরণও করতেন চাষিরা। এ রকম ১৫ থেকে ২০ রকমের নাম ও জাত আছে। সেই সব জাত থেকে তিন রকমের জারা বাছাই করা হয়। সেখান থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে বারি-১। এই জাতের জারা বেঢপ আকৃতির নয়। অনেকটা মসৃণ ও গাঢ় সবুজ রং। ঘ্রাণও তুলনামূলক বেশি। এই জারা এখন ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে।

মাটির উর্বরতা ও আবহাওয়া অনুকূল থাকায় সিলেটের পাহাড়-টিলা এলাকায় জারা লেবুর চাষ বহু পুরোনো। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ উপজেলায় প্রায় তিন শতাধিক জারা লেবুর বাগান রয়েছে। এর মধ্যে জৈন্তাপুরে শতাধিক বাগান রয়েছে। নতুন জাত ‘বারি-১’ চাষ হয়েছে জৈন্তাপুরের হরিপুর, শ্যামপুর, হরিপুর, বাগেরখাল, শিকারখাঁ, চিকনাগুল, উমনপুর, পানিছড়া, ঠাকুরের মাটি, কালিনঞ্জিবাড়ি ও গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর, বানিগ্রামে।

বর্ষাকালসহ ছয় মাস পর্যন্ত জারা লেবুর ভরা মৌসুম। চিকনাগুল, হরিপুর, ফতেহপুর, সালুটিকর বাজারে সাপ্তাহিক হাটবার ছাড়াও চলে চাষির কাছ থেকে সরাসরি জারা কেনাবেচা। সেই সব হাট থেকে সিলেট নগরীর বিভিন্ন মোড়ে সবজির হাটে ওঠে জারা। গ্রামের হাট থেকে শহুরে হাটে কেনাবেচায় দামে তারতম্য থাকে অবশ্য। আকারভেদে একেকটি জারা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, সিলেটের পাহাড়-টিলা অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া লেবুজাতীয় ফল চাষের জন্য উপযোগী। এ জন্য কমলা ও লেবুর চাষবাসের খ্যাতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জারাও। নতুন জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় চাষিদেরও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। লেবুজাতীয় ফলন সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে জৈন্তাপুরে ১২০টি বাগান পরিচর্যায় আওতায় আছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারুক হোসাইন।

জৈন্তাপুরের বাগেরখাল গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম জারা লেবুর চাষ করছেন বংশপরম্পরায়। নতুন জাতের জারার কলম চারা রোপণের দুই বছর পর থেকে ফলন পেতে শুরু করেছেন। তাঁদের টিলাশ্রেণির ৫০ শতক ভূমিতে জারা ছাড়া আর কোনো চাষবাসের সুযোগ নেই। জারার ভারে নুইয়ে পড়েছে সরু গাছ। সবুজ থেকে কিছুটা হলদে রং ধারণ করলেই জারা পরিপক্ব হয়। সিরাজুল ইসলাম জানান, নতুন জাতের জারার গাছে অন্তত পাঁচ বছর ফলন হবে। এখন বাগান থেকেই চলছে কেনাবেচা। বাড়তি কষ্ট করে বাজারে নিতে হচ্ছে না।

কৃষি তথ্য সার্ভিস জানিয়েছে, জারা লেবুর চামড়া বেশ পুরু, তবে রসের পরিমাণ খুবই কম। লেবুটির খোসা দিয়ে আচারও তৈরি করা হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা এ লেবুর বিশেষ ভক্ত। বর্তমানে সিলেটসহ বাংলাদেশের সব এলাকায় এ লেবুর চাহিদা বেশ বাড়ছে।

সুএ: প্রথম আলো

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ