ঢাকা [english_date] | [bangla_date]
প্রকাশিত: 11:31 PM, August 14, 2021
জাবেদ ভূঁইয়া..
শ্রীমঙ্গলে গত বছরের আগস্টে শুরু হয়েছিলো লকডাউন চা নামে একটি ছোট্টখাট্টো চায়ের দোকান। লোকজন যা টি স্টল নামে অবিহিত করে থাকে তার নাম লকডাউন চা, ভাবতেই ব্যাপারটা যেন কি রকম কি রকম লাগে!
হ্যাঁ, এটা চায়ের দোকান-ই যা অন্য আট দশটা চায়ের দোকানের মতন-ই শুরু হয়েছিলো পাড়ার মোড়ে।
কিন্তু গল্পটা অন্য আট দশটা চা স্টলের মতন ছিলো না তার কারিগরের। আসলে লকডাউন মানেই তো জরুরি কিছু না হলে বসতবাড়ির থেকে বের না হওয়া কিন্তু জীবনের তাগিদে বসতঘরের একটি অংশের কয়েক হাত জায়গা নিয়ে এক অন্যরকম গল্প তৈরি হয়েছে ‘লকডাউন চা ও ফাস্টফুড’ নাম থেকে।
মো.নাইমুল ইসলাম সুমন নামের এক তরুণ শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র ২ কি.মি. দূরে রামনগর মণিপুরী পাড়ায় গড়েন ‘লকডাউন চা এন্ড ফাস্টফুড’ নামে একটি ব্যতিক্রমী চায়ের দোকান। সেই লকডাউন চা এর নাম রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে শ্রীমঙ্গলে চারদিকে, দূর-দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেন চা-পিপাসু মানুষেরা, তেলেসমাতি ব্যাপার! ব্যতিক্রমী নামের জন্য আর ফেইসবুকের কল্যাণে এলাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের মানুষের কাছে লকডাউন চা এন্ড ফাস্টফুড নামটি পরিচিত লাভ করতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।
রামনগর মণিপুরী পাড়ার বাসিন্দা মো. মোজাম্মেল হক (৬০) এর দ্বিতীয় পুত্র মো. নাইমুল ইসলাম সুমন, কাজ করতেন ঢাকার একটি রেস্তোরায়। গত বছরের মার্চে দেশে দেশে করোনা রোগী শনাক্ত আর আতংক ছড়িয়ে পড়লে, প্রথম লকডাউন এর ঘোষণা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন উদ্বেগ আর অনিশ্চিত জীবন নিয়ে। এপ্রিল-মে-জুন-জুলাই ঘরেই বসেছিলেন লকডাউনে। সংসার খরচ নিয়ে ছিলেন ভীষণ চিন্তিত। সুমন এর মা চাইতেন তার ছেলে বাড়ির পাশে সবজি বিক্রি শুরু করুক। সুমনেরও অসম্মতি ছিলো না তাতে। কিন্তু সুমনের বাবা মোজাম্মেল হক চাইতেন তার ছেলে চায়ের ব্যবসা করুক।
সুমন এতে এক নতুন ধরণের আশার আলো পেলেন যেনো। রামনগর মণিপুরী পাড়ার সড়ক ঘেষা তিন শতক ভূমির বসত ঘর মোজাম্মেল হকের। সে বসত ঘরের সামনের অংশের কয়েক হাত জায়গায় তিনি নিজে একটা ছোট স্টেশনারি দোকান চালাতেন। এবার ছেলের জন্য ছেড়ে দিলেন কয়েক হাত জায়গা।
নাইমুল ইসলাম সুমন, এবার বিক্রি শুরু করলেন মাত্র দুই প্রকারের চা। রঙ চা আর দুধ চা- দুইটি চায়ের মান বজায় রেখেছিলেন তিনি। প্রতিদিন-ই তিনি চেষ্টা করতে সেই দুই প্রকারের চা আরও উন্নত করে গ্রাহকের হাতে তুলতে দিতে। এতে এলাকায় তার ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়, তিনি আরও উদ্যমী হয়ে উঠেন। লকডাউনে লকডাউনে সুমন বিভিন্ন প্রকারের চা, শরবত, ফুসকা, চটপটি ও ফাস্টফুড এর প্রতি নজর দেন, এটা তাকে গ্রাহকদের কাছে করে তুলে গ্রহণযোগ্য করে।
নাইমুল ইসলাম সুমন প্রবাস জার্নালকে জানালেন তার জীবনের আরও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তিনি খাবার তৈরির জগতেই প্রায় এক দশক থেকে । চায়ের কাজ শিখেছিলেন, দোকানও ছিলো তার ঢাকার খিলগাঁও এলাকার তালতলায় কিন্তু বাঁধ সাধে শরীর তার। ছিলেন দীর্ঘ দিন অসুস্থ, তাই তাকে থামতে হয়েছিলো। এরপরে আবারও শুরু করেছিলেন তিনি, খিলগাঁও মডেল কলেজের পাশে, ব্যবসা ভালোই চলছিল তার কিন্তু দোকানঘরের জামানত ও ভাড়া বাড়িয়ে মালিকপক্ষের কাছ থেকে তার এক ঘনিষ্ট বন্ধু সেই দোকান ঘরটি নিয়ে নেন। সেইসব দিনের স্বপ্ন নষ্ট করে দেয়, এটা তাকে এখনও পীড়া দেয়।
২০১৩ সালে সুমন তার এক আত্নীয় ভাইয়ের সাথে যৌথভাবে কক্সবাজারের লাবনী পয়েন্টে দিয়েছিলেন চায়ের দোকান, সেই ভাইসহ অনেকের কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন প্রায় ১৫ প্রকারের চা তৈরির কাজ কিন্তু সুমন জানালেন তিনি এখন ৬৪ প্রকারের চা বানাতে পারেন।
তিনি যাদের কাছ থেকে চা বানানো শিখেছিলেন তারাই এখন সুমনের চায়ের স্বাদে পঞ্চমুখ, তারা অবাক হন এ বিষয়ে এমনটাই জানালেন সুমন। সুমন জানালেন চা ছাড়াও তিনি শরবত, ফুসকা, চটপটি ও ফাস্টফুড বিক্রি করছেন সীমিত আকারে। এতে তিনি কোন ক্ষতিকারক উপাদান ব্যবহার করেন না বলে জানালেন।
সুমনের বাবা মোজাম্মেল হকের পৈতিক নিবাস বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের খনতাখালি গ্রামে। তিনি আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে এসেছিলেন শ্রীমঙ্গলে। কাজ করতেন স্থানীয় একটি চা বাগানের মুদি দোকানে, তাঁর এক ছেলে এখন চায়ের কারিগর বিষয়টা তাকে প্রচুর আনন্দিত করে বলেন জানালেন প্রবাস জার্নালকে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সুমনের অবস্থান দ্বিতীয়, তার বড় ভাই মো.নজরুল ইসলাম সুজন, চাকুরিজীবী, ছোট বোন শিল্পী বেগম গৃহিণী। সুমনের মা রাশিদা বেগম তাঁর পুত্রের বর্তমান অবস্থানে স্বস্তিতে আছেন। ব্যক্তিজীবনে সুমন বিবাহিত। রামনগর মনিপুরী পাড়ার-ই একজনের সাথে যৌথ জীবন যাপন করেছেন। তিনি সংসার জীবনে তিন ১ পুত্র ১ কন্যা সন্তানের পিতা।
ইতিমধ্যে তিনি লক ডাউন চা এন্ড ফাস্টফুড নামের চায়ের ব্যবসায় অভাবনীয় সাড়া পাওয়ায় ব্যবসার পরিধি একটু বড় করতে চেয়েছিলেন তাতে তিনি একটু বিপাকে রয়েছেন । প্রচুর গ্রাহক আসে তাই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দুরত্বর কথা ভেবে পাশেই ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় একটি ঘর নিয়েছিলেন কিন্তু লক ডাউন কঠোর হওয়ায় সেই দোকানের ভাড়া গুনতে হচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই।
সরেজমিনে দেখা গেলো, গ্রাহকদের প্রচুর চাহিদা কিন্তু গ্রাহকদের ফেরত দিচ্ছেন তারা করোনা আর লকডাউনের জন্য লকডাউন যে ব্যবসাকেন্দ্রের নাম তাদেরকেই মানতে হচ্ছে কড়াকড়িভাবে । তারা আশা করছেন লকডাউন এর আওতায় আর না বাড়লে আগামি ১১ আগস্ট থেকে তাদের লকডাউন চা ও ফাস্টফুড ব্যবসার পরিধি দ্বিগুণ বাড়বে এবং তাদের নতুন শো রুম চালু করা যাবে। আগের চেয়ে সেবার মান বাড়াবে। গ্রাহকের স্থানের সংকুলান হবে আগের চেয়ে বেশি। তবে সুমন পার্কিং নিয়ে একটু চিন্তিতও মনে হলো।
জয়নাল আবেদীন, পেশায় রঙ শ্রমিক, তিনি প্রায় আসেন লকডাউন চা ও ফাস্টফুডে একমাত্র উন্নত মানের চা পানের জন্য। শ্যামলী এলাকার শাওন চৌধুরী, আল আমিন, তুহিন আহমেদ এর সাথে কথা হয় তারা লকডাউনের প্রশংসা করে অভিযোগ করেন প্রতিটি আইটেমের দাম আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। এটা বিবেচনায় নিতে পরামর্শদাতা তারা।
লকডাউনে প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্বল্প সময়ের জন্য চালু করেন দোকানটি এরমধ্যে হাজির হলেন মৌলভীবাজার সদরের কদুপুর এলাকার মো.রবি হোসেন, আব্দুল্লা আল মামুন রাফি, আব্দুল হাইসহ আরও কয়েকজন। সুমন অর্ডার নিতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন লকডাউনের জন্য আমরা এলাকার বাহিরের গ্রাহকদের সার্ভিস দিই না। তিনি বলেন, উনারা আমাকে ফোন করেছিলেন আমি আসতে নিষেধ করছি। আমরা সবাইকে জানিয়েছি ১১ তারিখের পরে আসতে তারপরেও অনেক চলে আসেন। আমরা সবাইকে মানা করি এবং যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর দিই তারপরেও কেউ কেউ চলে আসছেন। আমরা প্রশাসনিক ঝামেলা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি। তারপরেও রমজান মাসের আগে আমাদের জরিমানা গুনতে হয়েছে। এটা আমরা চাই না।
মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রুমি প্রবাস জার্নালকে বলেন, সুমন আমার পূর্ব পরিচিত,ব্যতিক্রমী চিন্তা যার ব্যবসাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। এর প্রসার অব্যাহত থাকুক।
মণিপুরীপাড়ার বাসিন্দা কবি মাইবম সাধন, পেশাগত কারণে থাকেন ঢাকায়। তিনি প্রবাস জার্নালকে বলেন, একটি ছোট চায়ের দোকান তার নামের জন্য আলাদা পরিচিতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এটা কম কি! তিনি বলেন, শুনেছি এ দোকানের ফুসকা, চটপটি মণিপুরী পাড়ার ছেলে মেয়েদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
লকডাউন চা ও ফাস্টফুডের কাছেই দেশ-বিদেশের বিখ্যাত রমেশ গৌড়ের বিখ্যাত ৭ কালারের চা নীলকণ্ঠ আদি চা কেবিন। যার খবর দেশের সকল মিডিয়াসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও মাঝেমধ্যে স্থান পায়। তার পাশের ছোট একটি চায়ের দোকান লকডাউন চায়ের নাম যশ ছড়িয়ে যাচ্ছে এতে এক ধরণের ভাললাগা বোধ করেন সমাজকর্মী দেলওয়ার মামুন।
ভারতীয় টিভির জনপ্রিয় সিরিজ থেকে নাম নিয়ে এদেশের ব্যবসায়ীরা ঈদ পূর্জায় বাহারি পণ্যের বাজার সৃষ্টি করে ব্যবসা করেন এ বদনাম পুরনো কিন্তু রুদ্ধশ্বাস, রুদ্ধদ্বার সময়ে জীবনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে যে নাম দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন সুমন। তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী কামাল হোসেন।
লকডাউন চা ও ফাস্টফুড সম্পর্কে জানতে প্রবাস জার্নাল যোগাযোগ করে কবি ও শিক্ষক জাহাঙ্গীর জয়েস এর সাথে। তিনি এ ব্যাপারে বলেন, ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ডের ইংলিশ অভিধানে লকডাউন এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রদান করা হয়েছে।
আমরা এক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের ইংলিশ অভিধান অনুসরণ করে লকডাউন চা এন্ড ফাস্টফুড এর মানে বা অর্থ ‘সুরক্ষা’ হিসেবে ধরে নিতে পারি।
প্রধান সম্পাদক: নুরুল ইসলাম শেফুল অ্যাডভোকেট
সম্পাদক: মোঃ মতিন বকস
নির্বাহী সম্পাদক: শরীফ আহমেদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আফরোজ রায়হান
বার্তা সম্পাদক: পায়েল আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
মল্লিক কমপ্লেক্স পুরানা পল্টন ঢাকা-১০০০
ই-মেইল:nisheful@gmail.com
মোবাইল:+880 1778887058.01711224307.
01706760730,01711653241
Design by Raytahost